মাষ্টারজী শরীফ ইসলাম, পোশাক জগতের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ২০০৬ সালে মুম্বাই থেকে ফ্যাশন ডিজাইনে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। মুম্বাই, কেরালা এবং কলকাতার গার্মেন্টস শিল্পে তাঁর দক্ষতা ও প্রতিভার জন্য তিনি অত্যন্ত সম্মানিত।

জীবনের প্রায় ২০ বছর তিনি মুম্বাইতে এবং ৫ বছর কেরালায় প্যাটার্ন মাস্টার ও ডিজাইনার হিসেবে কাজ করেছেন। বড় বড় গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি এবং মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র জগতেও তিনি একজন সফল ডিজাইনার হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন।

যখন তিনি মুম্বাইয়ের দাদরে তিলক ভবনের সামনে একটি ফ্যাক্টরীতে কাজ করতেন, তখন তিনি শরীরের পরিমাপ না করেই শুধু এক পলক দেখে  তার গায়ের মাপে নিখুঁত পোশাক তৈরি করে দিতেন,এমন আজব প্রতিভা দেখতে দূর দূর থেকে লোক আসতো, আস্তে আস্তে মুম্বাইয়ের গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রির লোক তাঁকে  চিনতে শুরু করে, এবং কয়েক বছরের মধ্যেই তার নাম পুরো মুম্বাইতে ভাইরাল হয়ে যায়।

পৃথিবীতে হাজার হাজার রকম ড্রেস, হাজার হাজার রকমের ডিজাইন আছে। যেকোন ড্রেসের কোন জায়গায় কোথায় কত মেজারমেন্ট হবে তিনি জলের মতো মুখস্ত বলে দিতে পারেন।

তিনি হিন্দি, ইংলিশ, গুজরাটি, মারাঠি, আরবি, উর্দু, বাংলা, আসামি এমন আটটা ভাষায় কথা বলতে পারেন লিখতে পারেন ও পড়তে পারেন।

তিনি ছোটবেলা থেকেই একাধিক এনজিওর সঙ্গে যুক্ত। ২০০৭ সালে তিনি নিজেই একটি সমাজসেবা সংস্থা “আলমাদিনা সেবা সংঘ” প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, আজও শত শত দরিদ্র হিন্দু মুসলিম এই সংস্থা থেকে সেবা চিকিৎসা পোশাক ও অন্যান্য সহযোগিতা পেয়ে থাকেন ।তিনি বলেন এই পৃথিবীটাই আমাদের দেশ, এই পৃথিবীটাই আমাদের গ্রাম, এই পৃথিবীটাই আমাদের পাড়া। এই পৃথিবীতে আমরা সবাই একটাই পরিবার, আমাদের একটাই ধর্ম মানবতা, আমাদের একটাই পরিচয় আমরা মানুষ, আমরা সবাই এক।  

লকডাউনের সময়, যখন মানুষ ঘর থেকে বের হত না, গরিব মানুষ দিনের পর দিন কী খাবে এ কথা ভেবে মাস্টারজি এবং তাঁর টিম প্রতিদিন ৭০/৮০ জন দরিদ্র মানুষকে রান্না করে খাওয়াতেন। এই কাজের জন্য অল ইন্ডিয়া সুন্নাতুল জামাতের কর্ণধার মুফতি আব্দুল মাতিন সাহেব ও অনেক পার্টির নেতাকর্মীরা পরিদর্শনে এসে মাষ্টারজীকে ‘সমাজের হিরো,বলে প্রশংসা করেছিলেন।

তাঁর জীবনের উত্থান-পতন নিয়ে লেখা “অভিশপ্ত বিচার” বইটি একসময় এলাকায় এবং ইন্টারনেটে প্রচুর চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল। সমাজের সৎ চেতনা মানুষের কাছে ব্যাপকভাবে সমাদৃত হলেও সত্য কথা লেখার কারণে কিছু মানুষের রোষের শিকার হতে হয়েছিল । বাংলাদেশ এবং ভারতের যারা ইন্টারনেটে বইটি পড়েছেন তারা চিরকালের জন্য মাস্টারজির ভক্ত হয়ে ওঠেন। ( নতুন সংস্করণের জন্য এই বইটি ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, শীঘ্রই নতুন সংস্করণ প্রকাশিত হবে )

 

 একবার কিছু দুর্বৃত্ত তাঁর গাড়িতে হিংসা পর্বক ভাঙচুর চালিয়েছিল, তিনি মোটেই বিচলিত হননি , সেই ভাঙ্গা গাড়িটাকে গ্রাইন্ডার দিয়ে কেটে একটা নতুন রূপ দিলেন যেটা মানুষ দেখে অবাক হয়ে গেল। ছোটবেলায় সিনেমায় দেখা একটা হুটখোলা গাড়ি, ঠিক তেমনি একটা গাড়ি আবিষ্কার করে ফেললেন। গাড়িটা রাস্তার ধারে দাঁড়ানো দেখলে ২০ লাখ টাকার গাড়ি থেকে নেমে মানুষ মাস্টারজির গাড়ির সাথে সেলফি তোলেন। কোথাও গেলে মানুষের ভিড় জমে যায় গাড়িটা দেখতে,  নির্বাচনের সময় এলে স্থানীয় নেতা-মন্ত্রীরা মাস্টারজীর গাড়ি নিয়ে ভোট প্রচারে নামেন, নিউজ, ভিডিও, ফটো মানুষের মোবাইল ফোনে সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে, মাস্টারজী আবার ভাইরাল হয়ে গেলেন। তিনি যেন দুষ্কৃতিদেরকে নির্বাক উত্তর দিলেন, তোমরা আমার গাড়ি ভেঙে ক্ষতি করার চেষ্টা করেছিলে, সেই গাড়িটাকেই আমি মানুষের সামনে মডেল হিসেবে উপস্থাপন করে দিলাম।

ছোটবেলায় পাঁচ বছর মাদ্রাসায় পড়াশোনা করেছেন, তিনি ক্বারী এবং সাত পারা কোরআনের হাফেজ। মসজিদে আযান দিলে মনে হবে যেন ঢাকার মসজিদের আযান শুনছেন, কুরআন তেলাওয়াত ও গজল পরিবেশনে তাঁর দারুন প্রতিভা. ২০১০ সালে তিনি ভারতীয় রেল এ চাকরি পেয়েছিলেন কিন্তু করেননি, কারণ গার্মেন্টসের কাজের সঙ্গে তাঁর আবেগ জড়িয়ে আছে, তিনি বলেন বড় চাকরি করা লাগে না, প্রতিভা থাকলে ছোট কাজের মধ্য দিয়েও বড় হওয়া যায়।

 তাঁর পরিবার গ্রামের সব থেকে গরীব ছিল, তিনি বড় হয়ে রোজগার করতে শিখে পাড়ার সর্বপ্রথম  রয়েল এনফিল্ড বাইক কেনেন, পাড়ায় সবার আগে তিনি শোরুম থেকে চারচাকা গাড়ি কেনেন, তিনি সর্বপ্রথম ঘরে এয়ারকন্ডিশন নিয়ে আসেন, তিনি এই এলাকার সব থেকে সুন্দর ও সবথেকে উঁচু বাড়ি বানিয়েছেন, জিরো থেকে হিরো হবার এই কাহিনী যেন বলিউডের সিনেমা কেও হার মানিয়ে দেয়।

মাষ্টারজী শরীফ ইসলামের জীবন মানেই এক অনুপ্রেরণার গল্প—সংগ্রাম, প্রতিভা, পরিশ্রম ও মানবতার এক অনন্য উদাহরণ। তিনি শুধু একজন ডিজাইনার নন, তিনি একজন “কিং মেকার”, যিনি হাজার হাজার মানুষের জীবনে পরিবর্তন এনে দিয়েছেন।হাজার হাজার গরীব মানুষ তার কাছে কাজ শিখে আজ তারা মুক্তির পথ খুঁজে পেয়েছে।

২০২৬ এর শুরুর দিকে  তিনি একটা ই-কমার্স ওয়েবসাইট  লঞ্চ করেন www.hotsaleindia.com এই ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ভারতের যেকোনো প্রান্ত থেকে কেনাকাটা করা যায়, এই ওয়েবসাইটটা সম্পূর্ণ তিনি নিজে বানিয়েছেন বিনা কোডিং এ, যারা মনে করেন বিনা কোডিং এ ভালো ওয়েবসাইট বানানো যায় না। এই ওয়েবসাইটটা তাদের জন্য অনন্য উদাহরণ।

মুম্বাই কাটার রোডের একটি ফ্যাশন শিল্পে, তিনি মুম্বাইয়ের চলচ্চিত্র শিল্পী ও মডেলদের  ডিজাইনার পোশাক তৈরি করতেন এবং মুম্বাই সান্তাক্রুজে একটা স্কুল বানিয়েছিলেন Masterjee International Institute. দীর্ঘদিন পর, তিনি ভাবলেন যে তাঁর নিজের রাজ্যের জন্য কিছু করবেন। কলকাতা প্রযুক্তিতে অনেক পিছিয়ে আছে, তাই তিনি সর্ব প্রথমে কলকাতা মেটিয়াব্রুজে একটি কম্পিউটারাইজড গার্মেন্টস প্যাটার্ন পরিষেবা শুরু করেছিলেন, এখন মাস্টারজীর প্যাটার্নগুলি সারা  ভারতের সমস্ত অঞ্চলে অনলাইনে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তার স্কুল Masterjee International Institute মুম্বাই থেকে কলকাতায় নিয়ে আসলেন , আশা করা যায় এবার বাংলার যুবসমাজ  গার্মেন্টস প্রযুক্তির বিষয়ে নতুন দিশা খুঁজে পাবে।

Abdussamad Mondal, Student of Masterjee International Institute (Mumbai)